বাংলাদেশে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি একপেশে ঝোঁক দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ উদাসীনতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে ‘বাংলাদেশ জ্বালানি সম্মেলনে ২০২৫’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বহুজাতিক ব্যাংক’ শীর্ষক এক সেশনে এ তথ্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এনজিও ফোরাম অন এডিবির কো-অর্ডিনেটর শারমিন আক্তার বৃষ্টি। সেশনটি পরিচালনা করেন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান।
এনজিও ফোরামের প্রতিবেদন অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ার মোট ৫৭০টি জ্বালানি প্রকল্পে এডিবি কর্তৃক প্রতিশ্রুত ৯২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। উদ্বেগের বিষয় হলো এ বিপুল অর্থের সিংহভাগই গেছে গ্যাস-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে, যা দেশের জ্বালানি খাতকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর করে রাখছে। গ্যাসকেন্দ্রিক ৩৬টি প্রকল্পে মোট ৫ দশমিক ৯৯৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ১ দশমিক ২৩২ বিলিয়ন ডলার, গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে ১ দশমিক ১২ বিলিয়ন, গ্যাস খাত উন্নয়নে ৭০৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন, পরিকল্পনা খাতে ৬৬০ মিলিয়ন, পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যানে ৬০০ মিলিয়ন ও অন্যান্য গ্যাস-সম্পর্কিত প্রকল্পে ১ দশমিক ৩৯৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এডিবির গ্যাস খাতে অর্থায়নের ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ গেছে জীবাশ্ম জ্বালানিসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে। অবশিষ্ট ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ পেয়েছে নবায়নযোগ্য খাত। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতে ১১৮ মিলিয়ন ডলার (মোট সক্ষমতা ২২৫ দশমিক ৮ মেগাওয়াট) বিনিয়োগ করা হলেও বায়ুবিদ্যুতে তা ছিল শূন্য।
বাংলাদেশে এডিবির গ্যাস খাতে অর্থায়নের ৬০ শতাংশ এসেছে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স স্পেশাল ফান্ড (টিএএসএফ) থেকে, যেখানে ৩৬ শতাংশ এসেছে উচ্চ সুদের ঋণ (ওসিআর) থেকে।
গ্যাস সংকট ও প্রয়োজনীয় পাইপলাইন অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে এডিবি অর্থায়িত কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা যায়নি। এর মধ্যে রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট ও রিলায়েন্স মেঘনাঘাট ৭১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হলেও চালু হয়নি।
এনজিও ফোরাম অন এডিবির নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান বলেন, ‘এ কেন্দ্রগুলোই জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে ব্যয়বহুল উদাহরণ—বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত, কিন্তু জ্বালানি নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও নিষ্ক্রিয় প্রকল্পগুলোর জন্য বাংলাদেশকে ওসিআর ঋণের আওতায় উচ্চমাত্রার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।’ যা দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করেন তিনি।
এছাড়া এডিবি সমর্থিত পাঁচটি গ্যাস কেন্দ্রের মোট জীবন চক্রের কার্বন নিঃসরণ প্রায় ১৭৪ দশমিক ৭১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড হবে। এ প্রকল্পগুলো মেঘনা, মেঘনাঘাট ও ভৈরব নদীর তীরে ১৬০ একরের বেশি জমি দখল করে স্থাপন করা হয়েছে।
জ্বালানি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও সমস্যা’ শীর্ষক অন্য একটি সেশনে বক্তারা জানান, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নীতিগত নানা বাধার কারণে এর সম্প্রসারণ আশানুরূপ হচ্ছে না।
এ সময় অর্থের নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রায় ৯০ শতাংশ ঘরভিত্তিক রুফটপ সোলার সিস্টেম কার্যকর নয়। এগুলো মূলত নীতি পূরণের জন্য ইনস্টল করা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়। অথচ এ সিস্টেমগুলো সঠিকভাবে কাজ করলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদ্যুৎ যোগ করা যেত।’
বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আল মাহমুদ বলেন, ‘নবায়নযোগ্য শক্তিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের জন্য শক্তিশালী আর্থিক প্রণোদনা প্রয়োজন। অথচ সৌর প্যানেল ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর জন্য একাধিক বৈঠক হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।’
দিনের দ্বিতীয় সেশনে ‘রোল অব মিডিয়া ইন এনার্জি জাস্টিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, ‘২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সবাই তখন ব্যস্ত। এ সময় রাতের আঁধারে চট্টগ্রাম বাঁশখালীর প্রধান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এসএস পাওয়ার ওয়ান লিমিটেডের আমদানি পণ্যের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার কর মওকুফ করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘এসএস পাওয়ার কেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণের সময় স্থানীয়রা প্রতিরোধ তৈরি করেন। এ সময় গুলিবর্ষণে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। সেই হত্যার বিচার এখনো হয়নি। দেশের মানুষ জোরালো আন্দোলন করা সত্ত্বেও রামপালের পরিবেশ বিধ্বংসী বিদ্যুৎ প্রকল্পটি আটকানো যায়নি। এমনকি বর্তমান সরকারে এমন উপদেষ্টাও আছেন যারা পরিবেশ রক্ষার জন্য পরিচিত, কিন্তু তারাও জীবাশ্ম জ্বালানির পক্ষেই অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।’